বিশেষ ও সামান্য

দর্শন

সলিমুল্লাহ খান

ImageImageআমি কথাটা যে কোন মানুষকেই নির্দেশ করিতে পারে। তাই আমি মানে সর্বজন। সর্বজনের মধ্যেই আমার সত্য। কারণ সর্বজন মানে যেমন ‘আমি’ তেমনি আবার ‘আমি নহি’ও। তাই হেগেলের সিদ্ধান্ত: সত্য একই সঙ্গে হেথা এবং অন্য কোথা, এখানে এবং অন্য কোনখানে।… ভাষা ছাড়া সত্য ধরিবার পথ নাই।

মানুষ সেই প্রাণী যাহার মধ্যে মনের ‘ঊষ’ বা আবির্ভাব হইয়াছে। আমাদের এই প্রস্তাবে বিশেষ বড় বা নতুন কথা নাই। নতুন কথার পরের কথা বলিয়া একটা কথা কিন্তু আছে। এখানে সেই কথাই বলিতেছি।
আর আর প্রাণীর প্রাণ আছে কিন্তু মন নাই। বলিতেছি অন্তত মানুষের মন বলিতে যাহা বুঝায় আর আর প্রাণীর ঠিক তাহা নাই। প্রাণের অপর নাম জান। তাই প্রাণীর আরেক নাম দাঁড়াইয়াছে জানোয়ার। জানে জানা বুঝায়। তাই জানোয়ার জানে। মানুষও এক ধরনের জানোয়ার। তাই মানুষ জানে। তবে মনে রাখিতে হইবে প্রাণ আর মন ঠিক এক পদার্থ নহে। এই কথার প্রমাণ আমাদের ভাষায় পাইবেন। বাংলায় ‘প্রাণ’, ‘মন’ ও ‘দেহ’ প্রভৃতি পদ পদে পদে আলাদা পদার্থ নির্দেশ করিয়া থাকে। একই কায়দায় আমরা বলি ‘কায়া’, ‘মন’ ও ‘বাক্য’। মন আছে বলিয়াই মানুষ কিছু ‘মনে করে’। মন আছে বলিয়াই বাক্য। মনে করা মানে শুদ্ধ জানা নহে, জানার অধিক।
এই অধিকের মধ্যে আছে বাসনা। মন বলিতে তাই বাসনা বা বাস করিবার এষণা বুঝায়। ইংরেজি উনিশ শতকের বড় জার্মান লেখক হেগেল এই ‘জানা’ কথাটার বিশেষ বিচার হইতেই ‘ফেয়নোমেনলগি ডেস গায়েস্টেস’ (বা আমাদের অনুবাদে ‘বাসনার রাষ্ট্রভাষা’) প্রস্তাবটি রচনা শুরু করিয়াছিলেন। মনের শুরু জানা হইতে। আর ‘জানা’র ব্যাপার কিভাবে মনের ব্যবসায় অর্থাৎ বাসনার রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হয় তাহা তিনি তক্কে তক্কে দেখাইয়াছেন। বাংলা ‘প্রকাশ’ বা গ্রিক ‘ফেয়নোমেনন’ শব্দের আরেক বাংলা ‘রাষ্ট্র’ আর গ্রিক ‘লগি’ মানে বাংলায় যেমন ‘ন্যায়’ তেমন শব্দ বা ‘ভাষা’ও বটে। আজিকার এই নিবন্ধে আমরা হেগেলের প্রস্তাবটি সামান্য বিস্তার করিব।

হেগেলের বিচার অনুসারে জানার তক্ক শুরু হইয়াছে ‘কিছু’ হইতে। পাঠিকা নিশ্চয় আমল করিতেছেন ‘কিছু’ পদটার গঠনেই আছে ‘কি আছে’ কথার বাকসংক্ষেপ। জানার শুরুতে আছে জানার যোগ্য কোন বস্তু বা ‘কিছু’। এই অনুমানে দোষের কিছু নাই। আর জানার বলিয়াই এই বস্তু আমাদের ভাষায় সংক্ষেপ করার আবেগে ‘জন্তু’ পদে পরিচিত হইয়াছে। জানাজানি ব্যবসায়ের এই প্রথম পর্যায়ে ‘জান্তা’ বা যে জানে সে খানিক আড়ালে বা পিছনে পড়িয়া যায় আর ‘জন্তু’ মানে যাহা জানিবার বস্তু তাহাই সামনে চলিয়া আসে। জান্তা আর জন্তুর সম্বন্ধ লইয়াই হেগেলের পহেলা কারবার। জান্তা জন্তুকে জানে। এই পহেলা জানাটার অর্থ সঙ্গে সঙ্গে জানা, সাক্ষাৎ জানা, সামনাসামনি জানা। মাঝখানে কোন ধামা নাই, কোন দফা নাই, রফা নাই, কোন মধ্যস্থতা নাই, কোন ধামাধরার কি দাইমার দরকার নাই। বাংলায় ‘ইহা’ কিম্বা ‘এই’ বলিতে এই সাক্ষাৎ বস্তুই বুঝাইয়া থাকে। ‘ইহকাল’ কথার গোড়ায় এই ‘ইহ’ কথাটাই না কি সুন্দর মুখব্যাদান করিয়াছে!
বলিবার দরকার নাই যে ‘ইহা’ পদের বিপরীত বাংলা শব্দ ‘পর’। পরে পরলোক, পরমেশ্বর। ইহে ইহলোক, সাক্ষাৎ মনুষ্য। এই সাক্ষাৎ, প্রত্যক্ষ বা চাক্ষুষ জানাকে কমজান্তা আমরা বলি ‘সহজ জানা’ আর সবজান্তা তাঁহারা বলেন ‘অব্যবহিত জ্ঞান’। সকলেই বলেন সাক্ষাৎ জ্ঞানের তুলনা হয় না। এই জ্ঞান গহীন ও সমৃদ্ধ। অথচ হেগেল বলিতেছেন এই জানাটা প্রকৃত প্রস্তাবে বড় ভাসা পদার্থ, অতি হতদরিদ্র জন্তু। তবে এইখান হইতে শুরু করার অন্যথা নাই। হেগেল কহিতেছেন, ‘একেবারে গোড়াতেই কিম্বা মধ্যস্থ কিছুর তোয়াক্কা না করিয়াই যে জ্ঞান বা জানার কথা উঠিতেছে আমাদের জানার বিষয় খোদ সেই জ্ঞান ছাড়া কিম্বা মধ্যমার পাশমুক্ত, নির্মধ্যমা জ্ঞান বা যে বস্তু এমনিতেই সহজ আছে তাহার জ্ঞান ছাড়া আর কিছু হইতে পারে না।’ এই জ্ঞান চোখের, কানের, নাসিকার, জিহ্বার, ত্বকের কিম্বা নাম না জানা আর কোন ইন্দ্রিয়ের। ইহার নাম মহাত্মা হেগেল রাখিয়াছেন ‘ইন্দ্রিয়সততা’। দুঃখের মধ্যে, এই জ্ঞানের সততা ইন্দ্রিয়ের তীক্ষèতার উপর নির্ভর করে না।
এই সহজ জানাতেই আমরা যাহারা জান্তা তাহারা জানি ‘ইহা’ বা ‘এই’ একটা জন্তু বা জানার জিনিশ। জন্তুটা একটা ‘কিছু’ তো বটে। কিন্তু ‘ইহা’ যে কি বা কি বস্তু তাহা কিন্তু আমরা জানি না। আমরা শুদ্ধ বস্তুকে জানি, তাহার সহিত কিছু যোগ বা বিয়োগ না করিয়া জানি। আমরা ইহার মর্যাদা জানি কিন্তু পরিচয় জানি না। ‘বাসনার রাষ্ট্রভাষা’ প্রস্তাবে হেগেল জানাইতেছেন
ামাদের জানার এই পহেলা পর্বটা বড় অস্থির, ভারি ভঙ্গুর। ইহা পরে ধাপে আর ধোপে টিকিতে পারে না।
কেন ভঙ্গুর? তিনি বলিতেছেন সংসারে যত বস্তু কিম্বা জন্তু আছে প্রত্যেকেই নিজেকে ব্যক্ত বা প্রকাশ করিতেছে। কোন জান্তা তাহাকে দেখিতেছে কিনা কিম্বা শুনিতেছে কিনা বা ছুঁইতেছে কিনা তাহাতে তাহার পরোয়া নাই। এই বেপরোয়া বস্তু বা জন্তুকে আমাদের ভাষায় ‘ব্যক্তি’ বলে। আগেই শুনিয়াছি ব্যক্তি বড় ভাসা পদার্থ, অতি হতদরিদ্র জিনিশ। বাংলায় যাহাকে আমরা ‘ব্যক্তি’ বলিয়া তৃপ্তি পাইয়া থাকি ইংরেজি তাহাকে ‘ইন্ডিবিজুয়াল’ বা ‘অভাজন’ বলিয়া অতৃপ্ত থাকে। ‘অভাজন’ মানে যাহাকে আর ভাগ করা বা কাটা যায় না, আকাট। ইহা মূর্খ বিশেষ্যের বিশেষণ বটে। ‘এই’ বা ‘ইহা’ আপনাতেই ‘এই’ বা ‘ইহা’। যে বলিতেছে ‘আমি আছি’, মানে একটা উক্তি করিতেছে, সে আসলে নিজেকে ব্যক্ত করিতেছে। তাই সে ব্যক্তি। এখানে বস্তু হইলেও আমরা তাহার নাম ‘ব্যক্তি’ই রাখিব। কেননা সে নিজেকে নিজেই ব্যক্ত বা প্রকাশ করিতেছে। মনে রাখিতে হইবে এই উক্তি ভাষার আগে। মানে আমরা এই ‘উক্তি’ কথাটা এক্ষণে মাত্র রূপক আকারে প্রয়োগ করিতেছি।
এদিকে আপনি যখন অঙ্গুলি হেলাইয়া বলিলেন ‘এই’ বা ‘ইহা’ তখন আদেশ হইল ‘ইহা কি’ বলিতে হইবে। আর ‘ইহা কি’ বলিলেন তো আপনার অহঙ্কার গুড়াইয়া মতিচুর হইল। ধরা যাক আপনি বলিলেন, ‘ইহা সাপ’ কিম্বা ‘ইহা দড়ি’। তো আরো বলিতে হয় সাপ কিম্বা দড়ি কি বস্তু। দড়ি কিম্বা সাপ কিন্তু সামান্য কথাই। মানে যাহা সব দড়িকে বা সাপকে সমান করে সেই গুণের কথা না উঠিয়া পারিতেছে না। খোদ দড়ি বা সাপও যদি জিহ্বা নাড়াইয়া বলে ‘আমি সাপ বলিতেছি’ কিম্বা ‘আমি দড়ি বলিতেছি’ তো তাহারও বলা চাই সে দড়ি বা সাপের জাত মাত্র।
বলিতেছি কিনা আপনার চোখের সামনের বস্তুটা যদি সাপ কিম্বা দড়ির কোন একটা হইয়া থাকে তখন আরো প্রশ্ন উঠিবে। ইহা তো খোদ সামান্য সাপ বা দড়ি নহে, আর দশ সাপের এক সাপ বা পাঁচ দড়ির এক দড়ি। ইহাতে বরং নির্দেশ বা উদাহরণ বা বিশেষ হইল, উপদেশ বা সামান্য হইল না। দেখা যাইতেছে ‘জন্তুর’ সত্য জন্তুর মধ্যেও পাওয়া যাইতেছে না। পাওয়া যাইতেছে জান্তার মধ্যে, অন্তত জান্তার পাঁচ বা ততোধিক ইন্দ্রিয়ের মধ্যে। এখানে আমাদের দাবি ছিল স্বয়ং বস্তুর সততা বা জন্তুর নিশ্চিতজ্ঞান বা ব্যক্তির সততা। কিন্তু তাহা তো পাইলামই না, বরং পাইলাম বিশেষের মধ্যস্থতায় অনিশ্চিত উপদেশের আগাম নির্দেশ। অগত্যা মানিতে হইতেছে সেই পুরানা সত্য: ‘ইহা কি’ জিজ্ঞাসা করা বা জান্তার অনিশ্চিত নির্দেশটা ‘ইহা ইহাই’ বলিয়া দেওয়া জন্তুর নিশ্চিত উপদেশের চেয়ে ভাল।
এদিকে ‘ইহা’ বলা মানেই তো ‘ইহা কি’ জিজ্ঞাসা করাও। ‘কিছু’ মানেই তো ‘কিছু একটা’। ইন্দ্রিয়সততার ঘরে ‘কিছু’ নিজেকে যতটা ব্যক্ত করে তাহার অধিক গুপ্তও করে। তাই ব্যক্তির উপর ভরসা রাখা কঠিন। ব্যক্তিকে ব্যক্তি ছাড়াইয়া উঠিতে হয়। ইহা কি বলিতে বা নির্দেশ করিতে হয়। নহিলে বিশ্ববিধাত্রীর বিস্ময় জাগাইয়া তোলা তো পরের কথা, জান্তার নিজের সততায় নিজেরই বিশ্বাস জন্মিবে না। হেগেলের শাস্ত্রে এই নির্দেশকে ‘বিশেষ’ বলে। বিশেষ যখন দেখা দিল তখন ব্যক্তি আর ব্যক্তি রহিল না। তাহার সমাধি হইল। এই সমাধি হত্যার নহে, সত্যাগ্রহের। ব্যক্তির আত্মদান বৃথা যায় নাই। বিশেষের মধ্যে তাহার নবজন্ম হইয়াছে। আর একটু আগাইলে আমরা দেখিব ব্যক্তির অস্থিরতা হইতে যেমন বিশেষ তেমনি বিশেষের অস্থিরতা হইতে সামান্য জন্মাইতেছে। ‘এই’ হইতে ‘এইটা সাপ’ আর সেখান হইতে খোদ ‘সাপ’। হেগেলের প্রস্তাবানুসারে এই জন্মানোর কোন অন্যথা নাই। এই প্রকাশ অনন্যোপায়।
প্রস্তাবটি বুঝিতে হইলে ‘ইহা’ বা ‘এই’ পদটাকে আরো ভাঙ্গিয়া ভাঙ্গিয়া বলা যায়। শুদ্ধ ‘এই’ বলিয়া কিছু আর নাই। যেমন ‘এই’ বলিতে আমরাও হয় একভাবে বলিতেছি ‘এই সময়’ বা ‘এই ক্ষণ’ অর্থে ‘এখন’, কিম্বা আরেকভাবে বলিতেছি ‘এই স্থান’ বা ‘এই খান’ অর্থে ‘এখান’। ধরা যাইতে পারে আমরা জিজ্ঞাসিলাম ‘এখন কোন ক্ষণ?’ আপনি উত্তরিলেন, ‘কেন, এখন তো রাত্রি।’ আমরা বলিলাম, ‘তথাস্তু’। যদি ‘রাত্রি’ কথাটা সত্যই হইয়া থাকে, তাহা কাগজে লিখিয়া ফেলিলে তো কোন ক্ষতি হওয়ার কথা নহে। লিখিয়া রাখিলেন। পরদিন বেলা দুপুর হইল। তবু কাগজে রহিল ‘এখন রাত্রি’। ‘এখন’ মানে তাহা হইলে কি দাঁড়াইল? এখন দুপুর হইতে পারে আবার রাত্রিও হইতে পারে। তাই ‘এখন’ কথাটা ‘সামান্য’ হইল। আমরা বলিতেছি না যে ‘এখন’ বলিতে রাত্রি নির্দেশ করিতেছে না। বলিতেছি ‘এখন’ কথা যে কোন ক্ষণ নির্দেশ করিতে পারে। মানে ‘এখন’ শব্দে যেমন আমরা ‘যাহা রাত্রিকাল’ তাহা নির্দেশ করিতে পারি তেমনি ‘যাহা রাত্রিকাল নহে’ তাহাও নির্দেশ করিতে পারি।
কোন শব্দে যখন যুগপৎ ‘ইহা’ ও ‘ইহা নহে’ উভয়ই নির্দেশ করা যায় তখন জিজ্ঞাসিতেই হইবে এই শব্দের সত্য কোথায়? এই শব্দের সত্য বিরাজ করিতেছে তাহার নিজের আকারে। মানে সামান্যে। যাহা ‘ইহা’ ও ‘ইহা নহে’ দুই ব্যক্তিকেই সমান করে তাহাই তো সামান্য। ‘এখন’ কথাটা তো সত্য। এখন রাত্রি না হইলে কি হইবে, এখন তো ধরা যাউক দিবাভাগ বা অন্য কোন ক্ষণ হইয়াছে। ‘এখন’ কথাটার একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম হইয়াছে। কিন্তু তাহার আকারটা নিষেধাজ্ঞার মতন। এখন দিবাও নহে, রাত্রিও নহে। এখন দিবারাত্রির বাক্যবিশেষ। এই ধরনের বাক্যের নাম হেগেল রাখিয়াছেন ‘নাকার’ বাক্য বা ‘সামান্য নাকার’। ইংরেজিতে ‘নেগেটিব ইন জেনারেল’ লিখিলে বেহতর শুনাইবে।
ইহাতেই প্রমাণ আপনার ‘ইন্দ্রিয়সততার’ সত্য আপনি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে পাইতেছেন না, পাইতেছেন সামান্যে। দেখা যাইতেছে যে ধরনের জানাকে আমরা বড় জানা মনে করি সেই ধরনের জানা, যেমন চোখের দেখা, কানের শোনা প্রভৃতি তো এক অর্থে জানাই নহে। পহেলা পহেলা মনে হইয়াছিল যাহা হাতের কাছে, চোখের সামনে হাজির আছে তাহা তো ধরিয়া ধরিয়া অনুভব করিলেই কিম্বা রিনিয়া রিনিয়া দেখিলেই বুঝিতে পারি। অথচ এখন মনে হইতেছে তাহা সত্য পদবাচ্য নহে। সেই সত্য রাত্রি বা দিবার মতই পলাতক। শুদ্ধ এখনই স্থির। তবে নেহাত সেই স্থিরতা আছে অস্থিরতা বা নাকারের আকারে। হেগেল এই টানাপোড়েনের মুখে পড়িয়া গ্রিক ভাষার দ্বিরাচার বা ‘দিয়ালেক্টিক’ নামটা জপিয়াছেন।


‘এখন’ সম্বন্ধে যাহা খাটে ‘এখান’ সম্বন্ধেও তাহাই খাটিবে। মানে ‘এখান’ কথাটা বিচিত্র বহুগামী, মায় সর্বত্রগামীও। তাহার সত্যও সামান্য নাকারে প্রাপ্তব্য। শুদ্ধ জন্তুর মাঠে কেন জান্তার ঘরেও শুনা যাইবে এই অস্থিরতার কাড়ানাকাড়া। আমি কথাটা যে কোন মানুষকেই নির্দেশ করিতে পারে। তাই আমি মানে সর্বজন। সর্বজনের মধ্যেই আমার সত্য। কারণ সর্বজন মানে যেমন ‘আমি’ তেমনি আবার ‘আমি নহি’ও। তাই হেগেলের সিদ্ধান্ত: সত্য একই সঙ্গে হেথা এবং অন্য কোথা, এখানে এবং অন্য কোনখানে। আমরা যে চোখের দেখাকে বড় সত্য মনে করি তাহার প্রমাণ আমাদের ভাষার ‘সাক্ষী’ কথাটার মধ্যে রাষ্ট্র হইয়া আছে। এক্ষণে মনে হইতেছে আকাশ কি বস্তু জানিতে বা আকাশে সূর্যদেব কি করিতেছেন তাহা দেখিতে হইলে অন্য জান্তা চাই। খালি চোখাদর্শক বা সাক্ষীতে আর কাজ নাই।
মানুষ কেবল চোখে দেখিবে না, তাহার সামান্যও লাগিবে। এই সামান্যেরই অপর নাম ‘দিব্য’ বা পরম। এই সামান্য জিনিশটা ভাষার গুণবিশেষ। ভাষা পরের ধন পরম। ব্যক্তি আর ব্যক্তি নহে। ভাষাই ব্যক্তি। আর বিশেষও শেষ পর্যন্ত বিশেষ নহে। বিশেষের সহিত বিশেষের দেখা সামান্যের বাড়িতেই হইয়া থাকে। ভাষাই সেই সামান্য যাহার গুণ কীর্তনোপলক্ষে হেগেল ‘দিব্য’ শব্দটা এস্তেমাল করিতে কার্পণ্য করেন নাই।
ভাষা ছাড়া সত্য ধরিবার পথ নাই। ভাষাই রাজা। ভাষাই পরম। আর ভাষার প্রজা হইয়াই মানুষ সত্য ধরিতে পারে। তাই বলা যায় ভাষার মধ্যেই মন রাষ্ট্র হইয়াছে। মনের অপর নাম বাসনা। বাসনার অপর নাম বাক্য। কেন তাহা বলিবার সময় আজ আর নাই। বলিতে বলিতে এখন রাত্রি দিবা হইতেছে।

(লেখাটি প্রথম প্রকাশ পায় ৪ মে ২০১৩ সালে, একেএম আতিকুজ্জামান রাসেল সম্পাদিত সর্বজন পত্রিকায়। )

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com